রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:০৫ পূর্বাহ্ন

প্রতিনিধি আবশ্যক :
বহুল প্রচারিত অনলাইন পত্রিকা জয় বাংলা নিউজ ডট কম ( www.joibanglanews.com)এর জন্য জরুরী ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা/থানা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক (খালি থাকা সাপেক্ষে) প্রতিনিধি আবশ্যক। আগ্রহী প্রার্থীদের পাসপোর্ট সাইজের ১ কপি ছবি, জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি, অভিজ্ঞতা ( যদি থাকে) উল্লেখ পূর্বক জীবন বৃত্তান্ত এবং মোবাইল নাম্বার সহ ইমেইলে ( joibanglanews@gmail.com ) আবেদন করতে হবে।
শিরোনাম :
রাশিয়ায় বিক্ষোভ অব্যাহত, আটক ৭২৪ আমি জনকল্যাণকর কাজেই নির্বাচনী এলাকায় বাকী জীবনটা উৎসর্গ করতে চাই ……..সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশন ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী বিএনপি এখন ‘নালিশ পার্টি থেকে মাথা খারাপ পার্টি ……. তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আগামী নির্বাচনে সুশৃঙ্খল থেকে গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে হবে……ডেপুটি স্পিকার আগামীকাল শুভ মহালয়া নানা কর্মসূচিতে মীনা দিবস পালিত পুরো দেশকে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় আনা হচ্ছে…. টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী জলবায়ু ইস্যুতে ধনী দেশগুলোর ভূমিকা দুঃখজনক ……. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ময়মনসিংহের ঈশ্বর গঞ্জে শাওন হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত

সমাধি

সমাধি
তাসলিহা মওলা দিশা

“অসম্ভব, সাইজ্জা মিঞার কবর এই গোরস্থানে হবেনা”
বলল জাফর মিঞার ছেলে সাদেক। গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির ব্যবসা করে টাকা হয়েছে আজকাল বেশ। সে টাকার গরমে সেও ফুটছে রোঁয়া রোঁয়া। এ দুনিয়ায় টাকাই সব।
“হবে না, হবে না, তার কবর মিঞা বাড়ি গোরস্থানে হবে না” – শোরগোল তোলে বাড়ির আর সব জোয়ান ছেলেরা। বুড়ো বলতে এখন মিঞা বাড়িতে মাত্র দু’জন। শহীদ মিঞা আর মোমিন মিঞা। দেহের শক্তির মত তাদের কন্ঠও স্তিমিত প্রায়। ছেলেপুলের ওপর কথা বলার বয়স এটা নয়।
মিঞা বাড়ির কাছারি ঘরে বেশ একটা জটলা হয়েছে। বাড়ির উত্তর শরীকের এমদাদ মিঞার সেজ ছেলে আজাদ মিঞা ক্যান্সারে ভুগে মারা গেছেন আজ বিকেলে। সেজ মিঞার দোষ জ্ঞাতি সম্পর্কের সকলের ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে তিনি দেড়শ বছরের পুরনো বাপ দাদার ভিটা ছেড়ে নিজ জমিতে বাড়ি করেছিলেন। ঢাকায় স্থায়ী আবাস হবার দরুণ মাসান্তর বাড়ি আসতেন। গ্রাম দেশে খোলা বাড়ি রাখা এক বিপদ। আশেপাশের সকলে সেই বাড়িকে নিজের সম্পত্তি মনে করে। তাই তিনি বছর তিনেক আগে পুরো বাড়ির চৌহদ্দিতে সীমানা প্রাচীর করেছেন। এতেই যেন ঢিল পড়েছিল মৌচাকে৷ স্বার্থে ঘা লাগলে মানুষের আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে। সাইজ্জা মিঞার বাড়ি সুরক্ষিত হওয়াটা তাই কারোই সহ্য হলনা। মোটামুটি একঘরে করে ফেলা হল অমন দাপুটে, সম্মানী অফিসারকেও। তাতে অবশ্য আজাদ মিঞার কিছু গেল আসলনা। তিনি তাঁর মত চলতে ফিরতে লাগলে সোনাপুর গাঁয়ে। গাঁয়ের গরীব দুখীরা সাইজ্জা মিঞা বলতে অজ্ঞান। কেউ তাঁর কাছ থেকে খালি হাতে ফিরে যায়না। ব্যাতিক্রম শুধু তাঁর জ্ঞাতিরা। তাদের আবদার হল ভিন্ন। তারা চায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের এই মানুষটিকে ধরে সুবিধা আদায় করতে। কেউ আবদার নিয়ে গেলে চা, নাস্তা খাইয়ে বিদায় দেন নীতিবান মানুষটি।
জীবদ্দশায় যে মানুষটার বিন্দুমাত্র ক্ষতি কেউ করতে পারেনি, তার বাড়ির টিনের চালে রাতে বিরাতে ঢিল ছুঁড়েও ভয় দেখাতে পারেনি, মৃত্যুর পর এটাই তো সুযোগ তাকে হেয় করবার। তার মোক্ষম অস্ত্র বেছে নিয়েছে সাত পুরুষের গোরস্থানে লাশ দাফনের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে। ওদিকে ঢাকা থেকে মানুষটিকে নিয়ে রওনা দিয়েছে তার পরিবারের সবাই, আর আজাদ মিঞার ছোট ভাই সাজ্জাদ মিঞা।
কাছারিঘর এখন সরগরম। এক কোণে দাঁড়িয়ে চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে মসজিদের ইমাম ফারুক, আর মুয়াজ্জিন তারেক। বুঝিবা মেনে নিতে পারছেনা তাদের প্রিয় সাইজ্জা জ্যাঠার এই অপমান। হুংকার দিয়ে ওঠে সাদেক “কি করেছে সাইজ্জা মিঞা আমাদের বাড়ির জন্য? কিচ্ছু করেনাই। আঁতেল ছিল একটা। আধা নাস্তিক। মসজিদে নামাজও পড়তনা। আরে আমি নিজে দেখছি তারে রুশদীর বই পড়তে। তওবা তওবা”। প্রতিবাদ করে ওঠে তারেক ” সাদেক ভাই, মানুষটা নাই আর। আপনি এইভাবে তারে বলতে পারেননা। তাঁর মত পরহেজগার মুসলমান এই সোনাপুরে নাই। রুশদী না কার নাম কইলেন, সাইজ্জা মিঞার মত জ্ঞানী মানুষ আমি দেখিনাই। নাই নাই, ওইরকম মানূশ আর নাই, আর হবেনা”।
গর্জে ওঠে জোয়ান মিঞার বেটারা সব। টাকার গরমে ফুঁসে উঠছে একেকজন। কেউই আসলে অতীতে সুবিধা করতে পারেনি কোন। তাই মৃত্যুর পর মাটি দেয়া নিয়ে এই নোংরামি করেই সুখ নিচ্ছে।
এত হৈ হট্টগোলে কখন এসে দাঁড়িয়েছে আজাদ সাহেবের মেঝ ভাইয়ের বিধবা বৌ। মুখরা বলে গ্রামে তার বদনাম কম নেই। গলা উঠিয়ে বলে, “সাদেক, মালেক তোমরা এত বেঈমান? এই যে কাছারি ঘরে বসে মরা মানুষটার বদনাম করছ, এটা কার করা জানো? এই কাছারি ঘর, ওই ঘাটলা সব আমার দেওরার করে দেয়া। মিঞা বাড়ির পাট চুকিয়েছে সে তোমাদের যন্ত্রণায়। নাইলে বাপের ভিটা সে কখনোই ছাড়তনা। তার কবর এ গোরস্থানে না হলেও সোনাপুর গ্রামে মাটির অভাব নাই। এই সোনাপুরেই তার কবর হবে”। সায় দেয় ইমাম আর মুয়াজ্জিন। কখন কাছারি ঘরে এসেছে চেয়ারম্যান হাশিম, বয়সে তরুন। সে আসাতে সকলে নড়েচড়ে বসে।
হাশিম এসে বলে, মিঞা বাড়ির কেউ মারা গেলে তার কবর পারিবারিক গোরস্থানেই হবে। এটা এই বংশের নিয়ম। এর আগেও বহুজনে বহু অন্যায় করেছে। কাউকেই আমরা বাড়ির বাইরে দাফন দিইনাই। সাইজ্জা কাকার লাশ এই গোরস্থানেই দাফন হবে। ফারুক ভাই, আপনি যান, রাত বেড়ে গেছে, গোরখোদকদের খবর দেন”।
সকলে বিরস বদনে ফিরে যায় বাড়ি। আজাদ সাহেবের জ্ঞাতি বোনের ছেলে রাশেদ, আর ভাইপো হাশিম চেয়ারম্যান সে রাতেই গোরস্থানে ঢোকে কবরের জায়গা খুঁজতে। বর্ষা মৌসুম তাই শুকনো জায়গা নেই বললেই চলে। শেষ মাথে থেকে দেখতে দেখতে তারা মসজিদের পাশে এসে দাঁড়ায়। রাশেদ বলে ওঠে, হাশিম এইদিকে আয়। বড় দাদুর কবরের পাশে এই জায়গাটা দেখ”। হাশিম চেয়ারম্যান এগিয়ে যায়। দেখে আজাদ মিঞার মায়ের কবরের ঠিক পাশেই একটা খালি জায়গা, তার পাশেই মসজিদের জানালাটা দেখা যাচ্ছে।
পরদিন শুক্রবার। সকাল দশটায় দাফন সম্পন্ন হয় আজাদ সাহেবের। জানাজায় গ্রামের মানুষ সবাই এসেছে। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছিল ভোরে। দাফনের সময় খটখটে রোদ।
গতরাতের এত হট্টগোলের কথা তাঁর স্ত্রী পুত্র কন্যা কেউই জানলনা। এত সুন্দর জায়গায় স্বামী সমাধিস্থ হলেন দেখে আজাদ সাহেবের স্ত্রীর কান্নার তোড় বেড়ে গেল দ্বিগুন। শ্রাবণের ধারায় ধুয়ে যাচ্ছে তাঁর কান্না।
মিঞাবাড়ির মসজিদের ইমাম ফারুকও কাঁদছে, আল্লাহকে স্মরণ করছে। পৃথিবীর সকল হিসাব যেন রাখা আছে কারও কাছে। নইলে একেবারে মসজিদের পাশেই কবর হল এমন সফেদ দিলের মানুষটার?
কার সমাধি কোথায় হবে কে জানে? এমনও তো হতে পারে, সাদেক মাটিই পেলনা মরার পর? ভাবতেই তওবা পড়ে ফারুক।
মাস ছয়েক পরের কথা। মিঞা বাড়িতে কান্নার রোল। সাদেক আর তার ছোট ভাই মালেক মারা গেছে গাড়ি এক্সিডেন্টে। ফেরি থেকে পড়ে গেছে গাড়ি পদ্মার জলে। তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে। লাশ পাওয়া যায়নি কারোই।
ফারুক মৌলভী মসজিদে চলে আসে কাঁপতে কাঁপতে। নফল নামাজ পড়ে, ইস্তিগফার পড়ে মোনাজাত ধরে, কাঁদতে কাঁদতে বলে “আল্লাহ তোমার লীলা বোঝা দায়”।

খবরটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.




© All rights reserved  2019 Joibanglanews.com এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা নিষেধ।
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Translate »